গাঁজা খেলে কি হয়, এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো, মস্তিষ্ক কিছুক্ষণের জন্য স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। মনোযোগ, স্মৃতি, বিচারবুদ্ধি আর শরীরের সমন্বয় এলোমেলো হয়ে যায়। মেজাজও বদলায়। কেউ হালকা বা আনমনা বোধ করেন, কেউ হঠাৎ ভয় বা অস্থিরতায় পড়েন। প্রভাব কেমন হবে, তা নির্ভর করে কতটা খাওয়া হলো, গাঁজা কত শক্তিশালী, বয়স কত এবং শরীরের অবস্থা কেমন তার ওপর। এই লেখায় আমরা তাৎক্ষণিক প্রভাব, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি, আসক্তির লক্ষণ, ছাড়লে কী হয় এবং সাহায্য কোথায় পাওয়া যায়, তা নিয়ে কথা বলব।
গাঁজা হলো Cannabis sativa গাছের শুকনো ফুল, পাতা বা কাণ্ড। ইংরেজিতে একে মারিজুয়ানা বলা হয়। এর প্রধান নেশাজাতীয় উপাদানের নাম টিএইচসি (THC)। এটি মস্তিষ্কের কোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনুভূতি, স্মৃতি ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলোকে প্রভাবিত করে।
ধূমপানের কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রভাব শুরু হয়। খাবারের সঙ্গে খেলে শুরু হতে বেশি সময় লাগে, আর তখন প্রভাব দীর্ঘক্ষণ থাকে। এ কারণে অনেকে বুঝতে না পেরে আরও বেশি খেয়ে ফেলেন।
গাঁজার সবচেয়ে পরিচিত প্রভাব হলো মনোযোগ আর স্মৃতির ওপর। সদ্য শোনা কথা মনে থাকে না। একটা কাজ শুরু করে মাঝপথে ভুলে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়, প্রতিক্রিয়ার গতিও ধীর হয়।
এই কারণেই গাঁজা খেয়ে গাড়ি বা মেশিন চালানো বিপজ্জনক। নিজেকে ঠিক আছে মনে হলেও রাস্তায় হঠাৎ কিছু ঘটলে সময়মতো সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। চোখ লাল হয়, মুখ শুকিয়ে যায়, ক্ষুধা বাড়ে। হাত-পায়ের সমন্বয় কমে যায়। রং, শব্দ আর সময় নিয়ে অনুভূতি বদলে যায়, কারও কাছে মিনিটকে ঘণ্টার মতো লাগে।
সবাই এটা আরামদায়ক মনে করেন না। কেউ কেউ হঠাৎ প্রচণ্ড উদ্বেগ, প্যানিক, মাথা ঘোরা বা বিভ্রান্তিতে পড়েন। যাঁরা আগে কখনো খাননি, তাঁদের এমন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
প্রথমবারের অভিজ্ঞতা একেক জনের একেক রকম। কেউ শুধু হালকা ঝিমুনি আর হাসির প্রবণতা টের পান। কেউ বুক ধড়ফড়, ভয় বা বমি বমি ভাব নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন। শরীরের ওজন, আগের অভিজ্ঞতা, খাওয়ার ধরন, এমনকি তখনকার মানসিক অবস্থাও ফল বদলে দেয়।
তবে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন:
একবার বা দুবার খেলে বড় কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয় না, এমন কথা অনেকে বলেন। কিন্তু নিয়মিত খেলে ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে অল্প বয়সে শুরু করলে।
কৈশোর ও তরুণ বয়সে মস্তিষ্ক তখনও গড়ে ওঠে। এই সময়ে নিয়মিত গাঁজা খেলে শেখা, মনে রাখা আর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতায় সমস্যা হতে পারে। গবেষণা বলছে, যত অল্প বয়সে শুরু এবং যত ঘন ঘন ব্যবহার, ঝুঁকিও তত বেশি।
গাঁজা উদ্বেগ আর প্যানিকের অনুভূতি বাড়াতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ঘন ঘন বা বেশি শক্তির গাঁজা ব্যবহারে, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, অকারণ সন্দেহ, কাল্পনিক কিছু দেখা বা শোনা। এটাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় সাইকোটিক লক্ষণ বলে।
একটা বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। গাঁজা খেলেই সবার মানসিক রোগ হয় না। কিন্তু যাঁদের পরিবারে মানসিক রোগের ইতিহাস আছে, তাঁদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
গাঁজা ধূমপান করলে ধোঁয়া সরাসরি ফুসফুসে যায়। কাশি, কফ আর শ্বাসনালির জ্বালা তাই সাধারণ সমস্যা। তামাকের মতো একই ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ এতে থাকে, এবং গাঁজার ধোঁয়া সাধারণত গভীরভাবে টেনে ফুসফুসে আটকে রাখা হয়।
ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে গাঁজার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা এখনও অসম্পূর্ণ, ফলাফলও মিশ্র। তাই এ বিষয়ে কোনো পক্ষেই জোর দিয়ে দাবি করা ঠিক নয়। শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিটা অবশ্য প্রতিষ্ঠিত।
ক্ষতি সবসময় শরীরে দেখা যায় না। নিয়মিত গাঁজা খেলে ক্লাসে মন বসে না, অফিসের কাজ পিছিয়ে যায়, সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। ঝুঁকিপূর্ণ আচরণও বাড়তে পারে। যেমন, নেশার ঘোরে গাড়ি চালানো বা অনিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়া। এগুলো কাউকে দোষ দেওয়ার জন্য বলছি না। সমস্যাটা কোথায় শুরু হয়, সেটা বোঝার জন্য বলছি।
অনেকে বলেন গাঁজা খেলে মন শান্ত হয়, ঘুম আসে বা ক্ষুধা বাড়ে। এই অনুভূতি সত্যি হতে পারে। কিন্তু অনুভূতি আর প্রমাণিত চিকিৎসা এক জিনিস নয়।
কিছু দেশে নির্দিষ্ট ক্যানাবিনয়েড-ভিত্তিক ওষুধ নির্দিষ্ট রোগে, যেমন কিছু ধরনের মৃগীরোগ বা কেমোথেরাপির বমিভাবে, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করা হয়। এগুলো পরীক্ষিত মাত্রায় তৈরি ওষুধ। তাই বলে রাস্তায় বা বাজারে পাওয়া গাঁজা ধূমপান করা নিরাপদ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অপকারিতার দিকে আছে বিচারবুদ্ধি নষ্ট হওয়া, আসক্তি তৈরির সম্ভাবনা, উদ্বেগ আর মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি। সব মিলিয়ে ঝুঁকির পাল্লাই ভারী।
হ্যাঁ, হতে পারে। চিকিৎসার ভাষায় একে ক্যানাবিস ইউজ ডিজঅর্ডার বলা হয়। তবে যাঁরা গাঁজা খান, তাঁদের সবার আসক্তি হয় না। ঝুঁকি বাড়ে যদি কেউ অল্প বয়সে শুরু করেন, প্রায় প্রতিদিন খান, অথবা আগে থেকে উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো সমস্যা থাকে।
এর মধ্যে দুই-একটা লক্ষণ নিজের মধ্যে মিলে গেলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এটা থেমে ভাবার সংকেত।
নিয়মিত খাওয়ার পর হঠাৎ ছাড়লে শরীর ও মন সাময়িকভাবে বিরক্ত হয়ে ওঠে। একে উইথড্রয়াল বা প্রত্যাহার উপসর্গ বলে। মনে রাখবেন, সবার এটা হয় না, আর তীব্রতাও একেক জনের একেক রকম।
সাধারণত ছাড়ার এক-দুই দিনের মধ্যে উপসর্গ শুরু হয়, প্রথম সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি থাকে, এবং কারও কারও ক্ষেত্রে আরও কিছুদিন চলতে পারে। কতদিন চলবে, তা নির্ভর করে কত দিন ধরে, কত পরিমাণে খেয়েছেন এবং আপনার শরীর-মনের অবস্থার ওপর। বিশেষ করে ঘুমের সমস্যা অনেকের ক্ষেত্রে বেশি দিন থাকে।
অনেকেই সময়ের সঙ্গে ভালো বোধ করেন। মনোযোগ ও ঘুম ধীরে ধীরে ফিরে আসে। তবে নির্দিষ্ট কত দিনে মস্তিষ্ক পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরবে, তা বলা যায় না। এটা একেক জনের জন্য আলাদা, আর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারে না।
ছাড়ার জন্য কোনো জাদুকরী পথ নেই। তবে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ সত্যিই কাজে লাগে।
বাজারে “নেশা ছাড়ানোর” নামে যেসব ওষুধ, পাউডার বা ঘরোয়া টোটকা পাওয়া যায়, সেগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়। কোনোটা ক্ষতিও করতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো এড়িয়ে চলুন।
আসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিস্তারিত পদ্ধতি জানতে পড়ুন নিরাময় হাসপাতালের মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা পেজটি।
নিচের যেকোনো অবস্থায় চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন:
আর এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে অপেক্ষা না করে এখনই হাসপাতালে যান: তীব্র বিভ্রান্তি, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া (সাইকোসিস), বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা জ্ঞান হারানো।
খাওয়ার সময় ও কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত স্মৃতি ও মনোযোগ কমে, এটা নিশ্চিত। নিয়মিত ও দীর্ঘদিন খেলে, বিশেষ করে অল্প বয়সে শুরু করলে, প্রভাব বেশি দিন থাকতে পারে। কতটা থাকবে, তা ব্যবহারের ধরন আর ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে।
হ্যাঁ, প্রথমবারেই নেশার প্রভাব টের পাওয়া যেতে পারে। তবে তীব্রতা একেক জনের একেক রকম। কারও সামান্য ঝিমুনি লাগে, কারও আবার ভয় আর অস্থিরতা বেশি হয়।
হতে পারে। নিয়মিত খাওয়ার পর ছাড়লে অনেকের ঘুম আসতে কষ্ট হয় বা ঘুম ভেঙে যায়। এটা প্রত্যাহার উপসর্গের অংশ এবং সময়ের সঙ্গে সাধারণত কমে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঘন ঘন বা বেশি শক্তির গাঁজা ব্যবহারে উদ্বেগ এবং সাইকোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে গাঁজা খেলেই কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত হন না। পারিবারিক ইতিহাস আর শুরুর বয়সও গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যাঁ। অনেক মানুষ গাঁজা কমাতে বা পুরোপুরি ছাড়তে পেরেছেন। পরিবারের সমর্থন আর পেশাদার সহায়তা থাকলে পথটা সহজ হয়।
গাঁজা মনোযোগ, স্মৃতি আর বিচারবুদ্ধিকে বিপর্যস্ত করে। নিয়মিত ব্যবহারে আসক্তি, মানসিক চাপ আর ফুসফুসের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। কম বয়সে শুরু করলে ঝুঁকি আরও বেশি।
নিজের বা প্রিয়জনের গাঁজা খাওয়া নিয়ে চিন্তা হলে একজন যোগ্য চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। নিরাময় হাসপাতালের মাদকাসক্তি চিকিৎসা সেবা এ বিষয়ে পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে থাকে। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়।
চিকিৎসা পর্যালোচনা: [চিকিৎসকের নাম ও যোগ্যতা] · পর্যালোচনার তারিখ: [তারিখ]
তথ্যসূত্র: NIDA (National Institute on Drug Abuse), CDC, NHS।