প্রেসক্রিপশনে বা ডাক্তারের নোটে “HCR” লেখা দেখলে অনেকেই ঘাবড়ে যান, কারণ এটা পরিচিত কোনো রোগের নাম মনে হয় না। গুগলে সার্চ করলেও সহজে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না। আসলে HCR মানে Hysterical Conversion Reaction। সহজ কথায়, মনের ভেতরের চাপ যখন শরীরের ভাষায় প্রকাশ পায় এবং মেডিকেল টেস্টে কোনো শারীরিক রোগ ধরা পড়ে না, তখন এই ডায়াগনোসিস দেওয়া হয়।
এই লেখায় HCR এর পূর্ণরূপ, লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা এবং এটা হিস্টিরিয়া বা কনভার্সন ডিসঅর্ডারের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত, সবকিছু বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
HCR এর পূর্ণরূপ Hysterical Conversion Reaction। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে এই শব্দটা বহু বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে, বিশেষ করে যখন কোনো রোগী শারীরিক উপসর্গ নিয়ে আসেন কিন্তু এক্সরে, ব্লাড টেস্ট, সিটি স্ক্যান বা অন্য কোনো পরীক্ষায় কোনো সমস্যা পাওয়া যায় না।
মন যখন কোনো কষ্ট, ভয়, রাগ বা চাপ সরাসরি প্রকাশ করতে পারে না, তখন সেটা শরীরের মাধ্যমে বের হয়ে আসে। অনেকটা যেন শরীর নিজের ভাষায় বলছে, ভেতরে কিছু একটা ঠিক নেই।
আধুনিক সাইকিয়াট্রিতে “HCR” নামটা এখন আর সরাসরি ব্যবহার হয় না। গবেষকরা এটাকে একটা পুরনো এবং কিছুটা অস্পষ্ট টার্ম বলে মনে করেন, কারণ এর সংজ্ঞা চিকিৎসক থেকে চিকিৎসকে আলাদা হতে পারে। তবে এর পেছনের ধারণা এখনো কনভার্সন ডিসঅর্ডার এবং সোমাটোফর্ম ডিজঅর্ডারের সাথে মিলে যায়, যেগুলো আধুনিক ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়ালে স্বীকৃত।
HCR এর পেছনে কোনো একটা একক কারণ নেই। বরং কয়েকটা বিষয় একসাথে কাজ করে।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, পরিবারের মধ্যে মতবিরোধ বা অশান্তি, সম্পর্কের জটিলতা, পড়াশোনা বা চাকরির চাপ, কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা বা অতীতের আঘাত, এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারার অভ্যাস। এই বিষয়গুলো অনেক সময় একসাথে জমে থাকে এবং একসময় শরীরের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, কম বয়সী মেয়েরা এবং নারীরা HCR ডায়াগনোসিস বেশি পান। এর একটা কারণ হতে পারে, পরিবার বা সমাজে নিজের কষ্টের কথা সরাসরি বলার সুযোগ কম পাওয়া। মন যেটা বলতে পারছে না, শরীর সেটা অন্যভাবে দেখায়।
লক্ষণ রোগী অনুযায়ী আলাদা হয়, কারণ মনের চাপ শরীরের যেকোনো জায়গায় প্রকাশ পেতে পারে। সাধারণত যেসব লক্ষণ বেশি দেখা যায়:
হঠাৎ খিঁচুনি বা শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট বা বুক ধরফর, মাথাব্যথা, বুকে ব্যথা, পেটে ব্যথা বা হজমের সমস্যা, হাত পা অবশ হয়ে যাওয়া বা শক্তি কমে যাওয়া, কথা বলতে না পারা বা গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি, এবং কখনো কখনো অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা।
এই উপসর্গগুলো দেখতে পুরোপুরি শারীরিক রোগের মতো, এজন্য প্রথমে রোগীরা মেডিসিন বিভাগেই যান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের কথা মাথায় আসে না। অনেক রোগী একবার নয়, বারবার হাসপাতালে ভর্তি হন, কিন্তু প্রতিবারই রিপোর্ট স্বাভাবিক আসে।
রোগী যখন এসব উপসর্গ নিয়ে আসেন, ডাক্তার প্রথমে দরকারি পরীক্ষাগুলো করান। সব রিপোর্ট নরমাল আসার পরও যদি উপসর্গ থাকে, ডাক্তার বুঝতে পারেন এর পেছনে শারীরিক না, মানসিক কারণ আছে। তখনই প্রেসক্রিপশনে HCR ডায়াগনোসিস লেখা হয়।
এই রোগীদের সাম্প্রতিক জীবনে প্রায়ই দেখা যায় কোনো মানসিক চাপ, পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের সমস্যা বা কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার ইতিহাস। ডাক্তার সাধারণত এসব নিয়েও জিজ্ঞেস করেন, যদিও সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপের কারণে এই আলোচনাটা প্রায়ই খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ফলে অনেক রোগী HCR শব্দটা শুনেই বাড়ি ফিরে যান, এর প্রকৃত মানে না জেনেই।
HCR এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই, কারণ এটা শারীরিক রোগ নয়। চিকিৎসা মূলত কয়েক ধরনের হয়।
প্রথমত, ডাক্তার অনেক সময় তাৎক্ষণিক স্বস্তির জন্য হালকা ঘুমের বা শান্ত করার ওষুধ দিতে পারেন। এটা উপসর্গ কিছুটা কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু এটা মূল সমাধান নয়।
দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনে সাইকোথেরাপি। এখানে রোগী মনের ভেতরের চাপ, কষ্ট বা না বলা কথাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলার জায়গা পান। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি বা CBT এক্ষেত্রে অনেক রোগীর জন্য কাজে দেয়, কারণ এটা চিন্তার ধরন এবং প্রতিক্রিয়া বোঝার মাধ্যমে কাজ করে।
তৃতীয়ত, জীবনে যে চাপের উৎস আছে সেটা চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা এবং পরিবারের সাপোর্ট সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবার যদি বুঝতে পারে যে এটা কোনো নাটক বা ভান নয়, বরং মনের কষ্টের শারীরিক প্রকাশ, তাহলে রোগীর জন্য পরিবেশটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
অনেকেই মনে করেন HCR মানে রোগী মিথ্যা বলছেন বা অভিনয় করছেন। এটা সঠিক নয়। রোগী যা অনুভব করছেন, তার কাছে সেটা একদম বাস্তব। শরীর যেভাবে ব্যথা বা কষ্ট তৈরি করছে, রোগী নিজেও সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে করছেন না।
আরেকটা ভুল ধারণা হলো, HCR মানে রোগীর কোনো সমস্যাই নেই। আসলে সমস্যা আছে, কিন্তু সেটা শরীরে নয়, মনে। এই পার্থক্য বোঝা গেলে চিকিৎসার দিকে এগোনো সহজ হয়।
মূলত হ্যাঁ। তিনটার পেছনের ধারণা একই, মানসিক সমস্যা শরীরের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। তফাত মূলত নামকরণে এবং কোন সময়ে বা কোন প্রেক্ষাপটে শব্দটা ব্যবহার হচ্ছে তাতে। HCR শব্দটা মূলত বাংলাদেশের হাসপাতালের প্রেক্ষাপটে বেশি দেখা যায়, যেখানে হিস্টিরিয়া এবং কনভার্সন ডিসঅর্ডার আন্তর্জাতিক ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়ালেও ব্যবহৃত হয়।
হিস্টিরিয়া নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন আমাদের আগের লেখা হিস্টিরিয়ার কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার। কনভার্সন ডিসঅর্ডার নিয়ে পড়তে পারেন কনভার্সন ডিসঅর্ডার কি, কেন হয়, লক্ষণ ও চিকিৎসা।
প্রেসক্রিপশনে HCR লেখা থাকলে এবং উপসর্গ চলতে থাকলে, শুধু মেডিসিন বিভাগে না গিয়ে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলা ভালো। কারণ আসল কারণটা মনের ভেতরে, এবং সেটা সমাধান না হলে উপসর্গ ঘুরেফিরে আসতেই থাকে। বারবার হাসপাতালে যাওয়া, একই টেস্ট বারবার করানো এবং কোনো ফল না পাওয়ার এই চক্র থেকে বের হতে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য জরুরি।
নিরাময় হাসপাতালে কাউন্সেলিং এবং সাইকোথেরাপির ব্যবস্থা আছে, যেখানে অভিজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের সমস্যা নিয়ে নিয়মিত কাজ করেন।