|

ফেন্সিডিল কী এবং কেন এটি আসক্তি তৈরি করে? Niramoy Hospital

ফেন্সিডিল আসক্তি কী? লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

“ঠান্ডার জন্য ওষুধ খাচ্ছি।” কথাটা বলছে, আর বোতল শেষ হচ্ছে। তারপর আরেকটা নিয়ে আসছে। তারপর আরেকটা। কিন্তু কাশি সেটা কবেই সেরে গেছে।

পরিবার ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সমস্যাটা কোথায়। ছেলেটা বা মেয়েটা দিনে দিনে বদলে যাচ্ছে। চোখ লাল, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, বন্ধুরাও পাল্টে গেছে। রাগ করলে চিৎকার করে উঠছে, “আমার কিছু হয়নি।”

বাংলাদেশে ফেন্সিডিল নিয়ে বড় সমস্যা এটাই যে এটাকে কেউ মাদক ভাবতে চায় না। কাশির ওষুধ বলেই জানে সবাই। অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে কোডেইনযুক্ত কাশির ওষুধ অন্যতম প্রধান আসক্তির কারণ।

ফেন্সিডিল কী এবং কেন এটি আসক্তি তৈরি করে?

ফেন্সিডিল এক ধরনের কাশির সিরাপ। বাজারে সহজে পাওয়া যায়, দাম কম, এবং নাম শুনলে মনে হয় নিরীহ কিছু। কিন্তু এর ভেতরে যে উপাদান আছে সেটা নিরীহ না।

ফেন্সিডিলে দুটো মূল উপাদান থাকে, কোডেইন আর ক্লোরফেনিরামিন। কোডেইন আফিম পরিবারের ওষুধ। শরীরে ঢোকার পর এটা মরফিনে রূপান্তরিত হয় এবং মস্তিষ্কে ডোপামিন ছাড়ে। প্রথমবার খেলে একটা হালকা শান্ত অনুভূতি হয়, ঘুম ঘুম ভাব, চিন্তা কমে যায়।

সমস্যা হলো মস্তিষ্ক দ্রুত এই পরিমাণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আগে একটা বোতলে যা হতো এখন দুটো লাগছে, তারপর তিনটা। না পেলে শরীরে ব্যথা, ঘুম আসছে না, মেজাজ থাকছে না। সেই কষ্ট থেকে বের হতেই আবার খেতে হচ্ছে। এভাবেই চক্রটা তৈরি হয়।

ভারতের সীমান্ত থেকে আসায় দাম কম, কিনতেও তেমন প্রশ্ন হয় না। এটা সমস্যাটাকে আরও ছড়িয়ে দিয়েছে।

ফেন্সিডিল আসক্তির লক্ষনঃ শারীরিক ও মানসিক

শারীরিক লক্ষণ

চোখ প্রায়ই লাল থাকে, ঘুম ঘুম ভাব কাটে না। কথা বলার সময় জড়িয়ে যায়, মাঝে মাঝে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। ক্ষুধা কমে যায়, ওজন দ্রুত কমে। কোষ্ঠকাঠিন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। মাথা ঘোরানো লেগেই থাকে।

আচরণগত লক্ষণ

ফেন্সিডিলের বোতল লুকিয়ে রাখছে। টাকার জন্য বারবার চাইছে, মিথ্যা বলছে। বাড়িতে টাকা বা জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে। পুরনো বন্ধুর সাথে যোগাযোগ নেই, নতুন কিছু মানুষের সাথে মেলামেশা বেড়েছে যাদের কেউ চেনে না। স্কুল বা অফিসে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

মানসিক লক্ষণ

ফেন্সিডিল না পেলে অস্থিরতা এত তীব্র হয় যে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে যায়। সামান্য কথায় রেগে যাচ্ছে। পরিবারের সাথে দূরত্ব বাড়ছে। কোনো কাজে মন নেই।

যদি উপরের বেশিরভাগ লক্ষণ একসাথে দেখা যায় এবং বাড়িতে খালি বোতল পাওয়া যায়, “নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে” বলে অপেক্ষা না করে আগে বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।

দীর্ঘদিন খেলে কী হয়?

ফেন্সিডিলে প্যারাসিটামলও মেশানো থাকে। বেশি মাত্রায় দীর্ঘদিন খেলে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কখনো কখনো স্থায়ীভাবে। কিডনিতেও চাপ পড়ে।

কোডেইন শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর করে দেয়। অতিরিক্ত মাত্রায় নিলে শ্বাস বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি সত্যিকারের।

মস্তিষ্কে প্রভাবটা আরও দীর্ঘমেয়াদী। স্মৃতিশক্তি কমে, মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে মস্তিষ্ক এখনো পরিপক্ব হচ্ছে, তাই এই বয়সে আসক্তি হলে ক্ষতিটা আরও গভীরে যায়।

ফেন্সিডিল আসক্তির চিকিৎসা কোথায় এবং কিভাবে

ফেন্সিডিল আসক্তি ইচ্ছাশক্তির সমস্যা নয়। এটা একটা শারীরিক ও মানসিক রোগ, এবং চিকিৎসায় সুস্থ হওয়া যায়।

ডিটক্সিফিকেশন

প্রথম ধাপে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শরীর থেকে মাদক বের করা হয়। বাড়িতে হঠাৎ বন্ধ করলে withdrawal-এর কষ্ট তীব্র হয়, কখনো বিপজ্জনকও হতে পারে। তাই এই ধাপটা একা সামলানোর চেষ্টা না করাই ভালো।

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা

ডাক্তার প্রয়োজনমতো ওষুধ দেন যা withdrawal-এর কষ্ট কমায় এবং আসক্তির টান ধীরে ধীরে কমিয়ে আনে। নিজে থেকে কোনো ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা ঠিক না।

কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি

শরীর সুস্থ হলেই সব শেষ হয় না। কেন আসক্ত হলো, কোন পরিস্থিতিতে খেতে ইচ্ছা করে, এটা বোঝা না গেলে আবার ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। CBT বা কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি, গ্রুপ থেরাপি এবং পরিবারের সাথে কাউন্সেলিং এই কাজ করে। নিরামায় হাসপাতালের অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এই সেশনগুলো পরিচালনা করেন।

ইনপেশেন্ট রিহ্যাব

আসক্তি গভীর হলে বা বাড়িতে সহায়ক পরিবেশ না থাকলে ভর্তি হওয়া দরকার। নিরামায় হাসপাতালে পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা ব্যবস্থা আছে, ২৪ ঘণ্টা নার্সিং সেবা আছে। হাসপাতালটি সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অনুমোদিত।

চিকিৎসার পরের ধাপ

চিকিৎসা শেষ হওয়া মানেই যাত্রা শেষ নয়। রিল্যাপস অনেকের ক্ষেত্রেই হয়, এটা অস্বাভাবিক না। নিয়মিত ফলো-আপ, সাপোর্ট গ্রুপ এবং পরিবারের সচেতনতা এই ঝুঁকি কমায়।

পরিবার কি করতে পারে

রাগ হওয়া, লজ্জা লাগা, বিশ্বাস না করতে পারা, এই অনুভূতিগুলো খুব স্বাভাবিক। তবে এই আবেগ থেকে সিদ্ধান্ত নিলে রোগী আরও দূরে সরে যায়।

জোর করে ছাড়ানোর চেষ্টা বিপজ্জনক। বাড়িতে আটকে রেখে ওষুধ না দেওয়া কাজ করে না। শরীর থেকে মাদক বের হলেই আসক্তি যায় না, মনের আসক্তিটা থেকে যায়।

পরিবারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো রোগীকে চিকিৎসার কাছে নিয়ে আসা। প্রথমে নিজেরা একজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। তিনি বলবেন কীভাবে সেই কথাটা তুলতে হবে, কীভাবে রাজি করাতে হবে।

আসক্তি থেকে বের হওয়া কঠিন, এটা সত্যি। তবে সঠিক সময়ে সাহায্য নিলে পথটা অনেক ছোট হয়। অনেক পরিবার এই পথ পার করেছে।

নিরামায় হাসপাতালে প্রাথমিক পরামর্শ বিনামূল্যে। ঠিকানা: ১৩/১৯, ব্লক-বি, বাবর রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: 01758338888 বা 01758883355

BOOK APPOINMENT